পেশাদারিত্ব: ডাক্তার বনাম সাংবাদিক

অন্যান্য অনেক পেশার চাইতে ডাক্তার এবং সাংবাদিকদের পেশাদারী আচরণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভুল চিকিৎসার ফলে যেমন একজন মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে তেমনি ভুল সংবাদ পরিবেশনের ফলে লেগে যেতে পারে দাঙ্গা।

professionalism

মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধক্ষেত্রেও এই দুই পেশার মানুষ নিরপেক্ষ বলে শ্রদ্ধা পান। অার কোন পেশার মানুষ এই সম্মান টা পান বলে আমার জানা নাই।

ডাক্তারদের পেশাদারি আচরণের মানদন্ড নির্ণয় করা কঠিন বটে। খুব সহজ কথায় তারা একাধারে হবেন সৎ, চৌকস এবং মানবতার সেবায় সদা নিবেদিত। ডাক্তারদের ছুটি বলে কিছু নেই। রোগী সামনে থাকলে তাকে এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসার জন্য। তা সে হাসপাতালেই হোক বা হলিডে রিসোর্টেই হোক। এবং চিকিৎসা প্রদানে তিনি থাকবেন সৎ এবং মনোযোগী। কারণ তার একটু ভুলের খেসারত হতে পারে একটা জীবন।

এবার আসি সাংবাদিকদের কথায়। সাংবাদিকদের অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্য তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। দেশের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। আইনের প্রতি থাকতে হবে শ্রদ্ধা। এবং তথ্য সংগ্রহে হতে হবে চৌকস। সাংবাদিকদের সাফল্যের একটা উদাহরণ হলো ব্যাপক প্রশ্ন ফাঁসের পর আজকের অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল।

সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করবেন, সে ব্যপারে বিশেষজ্ঞ মতামত সংগ্রহ করবেন। এবং নিরপেক্ষ ও ববসবস্তুনিষ্ঠভাবে সে তথ্য পরিবেশন করবেন। কিন্তু সাংবাদিক নিজেই যদি হয় বিশেষজ্ঞ সেখানেই ঘটে বিপত্তি।

ডাক্তার বনাম সাংবাদিক এই দ্বৈরথে শুধু ডাক্তার নয়, সাংবাদিকদেরও পেশাদারিত্বের অভাব লক্ষণীয়। ডাক্তার যদি ডিউটি টাইমে ডেটিংএ যান এ বিষয়ে নিউজ করার জন্য বিশেষজ্ঞ মতামতের দরকার নাই অবশ্যই। ডাক্তার যদি অফিস টাইমে প্র্যাকটিস করেন, এ বিষয়েও বিশেষজ্ঞ মতামতের দরকার নাই। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাক্তার কত টাকা কমিশন নেন এ ব্যাপারেও নিউজ ছাপানোর জন্য বিশেষজ্ঞ মতামতই যথেষ্ট।

কিন্তু ডাক্তার ভুল চিকিৎসা দিল নাকি সঠিক চিকিৎসা দিল এই ব্যাপারটা সাংবাদিক জানবেন কি করে? অবশ্যই তাকে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে। চিকিৎসা ভুল ছিল নাকি সঠিক ছিল এইটা বোঝার জন্য সাংবাদিককে চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী এই রকম কারো কাছেই মতামত নিতে হবে। রোগী মারা গেলেই চিকিৎসা ভুল ছিল, এটা আবেগ ভিন্ন কিছু নয়। ডাক্তারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য এই আবেগ যথেষ্ট নয়।

আমাদের দেশে ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’ টাইপের সংবাদ গুলোতে কোনটাতেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কোন মতামত দেখি না। এটা পরিষ্কার ভাবে পেশাদারিত্বের লঙ্ঘন। মানুষের বিবেক ভোঁতা হলেও কারও জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেখলে বা নিউজপেপারে নিউজ দেখলে মানুষ গর্জে ওঠে। এতে দাঙ্গাও বাধতে পারে। এমনকি ডাক্তারের জীবন হতে পারে বিপন্ন।

ডাক্তার, ‍সাংবাদিক সহ সকল পেশাজীবীর পেশাদারিত্বের মানদন্ড নির্ণয় করা হোক। সকলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক। ব্যক্তিগত/পেশাগত দ্বন্দ্বের কুৎসিৎ বিস্ফোরণে কারও জীবন যাতে হুমকির মুখে না পড়ে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

 

বিঃদ্রঃ মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হবে আর  সেই কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তাররা হবেন ফেরেশতার মত এটা আশা করা বাতুলতা মাত্র।

বুক রিভিউ: বেতাল পঞ্চবিংশতি

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আমরা চিনি একজন শক্তিমান লেখক, সমাজ সংস্কারক এবং শিক্ষা সংগঠক হিসেবে। তাঁর আারও অবদান হচ্ছে বাংলা গদ্যরীতি প্রচলনে তাঁর অবদান। সে হিসেবে বলতে গেলে বলতে হয় বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের সন্ধানের প্রথমদিকে যে ক’জন ক্ষণজন্মা ব্যক্তি ইংরেজি বাবুয়ানিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর তাদের অন্যতম। তাঁর সম্বন্ধে অনেক গল্প প্রচলিত আছে সেগুলার কোনগুলা মিথ এবং কোনগুলা সত্য তা যাচাই করা এই অধমের পক্ষে সম্ভব হয় নি।

বেতাল পঞ্চবিংশতি বিদ্যাসাগরের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। তিনি এটি রচনা করেন কারণ সে সময় মানসম্মত বাংলা পাঠ্যপুস্তক ছিল না। সাধুভাষায় রচিত হওয়ার কারণে এটি অনেকটাই দুর্বোধ্য। সে হিসেবে আমি নিজেও বেতাল পঞ্চবিংশতি কতটুকু বুঝতে পেরেছি সে প্রশ্ন করাই যায়। তারপরও রিভিউ লিখতে বসলাম যতটুকু বুঝতে পেরেছি তার উপর ভিত্তি করেই।

বেতাল পঞ্চবিংশতি
মৃতদেহের ভেতরে প্রবেশ করা এক বেতালের বলা গল্প নিয়েই এগিয়ে যায় বেতাল পঞ্চবিংশতির প্লট। ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

 

 

বেতাল পঞ্চবিংশতি কে আমরা অনুবাদ সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু এটি সরাসরি অনুবাদ নয়। এডুলাইট এর বর্ণনামতে, এটি সংস্কৃত “বেতাল পঞ্চবিংশতি” বা “বৈতাল পঁচিশি” এর আলোকে লেখা। সংস্কৃত লেখকের নাম এবং মূল গল্পের সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে বিদ্যাসাগরের বেতাল পঞ্চবিংশতিতে এক বেতালের গল্প বলা আছে যে পঁচিশটি গল্প বলে।

গল্পের শুরু টা উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের সিংহাসনে আরোহণ নিয়ে। রাজা বিক্রমাদিত্য ঘটনাচক্রে পড়ে যান এক বেতালের পাল্লায়। বেতাল তাকে শর্ত দেয় যে পঁচিশ টা গল্প রাজাকে শুনতে হবে এবং প্রত্যেক গল্পের শেষে রাজাকে বেতালের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বেতালের এই পঁচিশটা গল্পের কারণেই গ্রন্থের নাম হয়  “বেতাল পঞ্চবিংশতি”।

গল্পগুলো কেবলমাত্র গল্প নয়। এর প্রতিটা গল্পই আজকের প্রেক্ষাপটে আমাদেরকে কিছু মেসেজ দেয় গল্পের ছলে। এগুলো আবর্তিত হয় রাজ্য পরিচালনা, মানব-মানবীর সম্পর্কের রসায়ন, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের জাতধর্ম, বিভিন্ন কূটকৌশল ইত্যাদিকে ঘিরে। সে হিসেবে বেতাল পঞ্চবিংশতি নীতিবাক্য এবং রসের এক অপূর্ব সমন্বয়।

বিক্রমাদিত্য তাঁর প্রজ্ঞা এবং ধৈর্য দিয়ে বেতালের সব গল্প শোনেন এবং তাঁর প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে তাঁর উদ্দেশ্য হাসিল করেন। যে গল্পগুলো ভালভাবে বুঝতে চাইলে এক বারে বোঝা খুব কঠিন।

বাংলা বই পড়ুন। বাঙালি সত্তাকে আরও ভালভাবে জানুন।

বুক রিভিউ: বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর

বুক রিভিউ:  বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর

তারেক শামসুর রেহমান

শোভা প্রকাশ (২০১০) ঢাকা

ড. তারেক শামসুর রেহমানকে মূলতঃ আমরা জানি রাজনীতির একজন বিশ্লেষক হিসেবে।তিনি যতটা না জাতীয় রাজনীতির বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত, তারচেয়ে বেশি পরিচিত আন্তর্জাতিক রাজনীতির একজন দুঁদে বিশ্লেষক হিসেবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তাঁর পড়াশোনা প্রায় জীবনভর। এবং তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ “বিশ্ব রাজনীতির এক শ বছর“।

বিংশ শতাব্দীতে যেসব ঘটনা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল প্রায় সবগুলোই তিনি স্পর্শ করে গেছেন। একাডেমিক বিশ্লেষণে সম্পৃক্ত করে গেছেন আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন সব ঘটনাকে। সময়ানুক্রমিক সূত্র রক্ষা করে অনেক বিচ্ছিন্ন বিন্দুকে জোড়া লাগিয়ে তিনি একটু সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে গেছেন তাঁর ক্ষুরধার বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে কোন ঘটনার পর কোনটা ঘটল দুটা ঘটনার মধ্যে মিলটা কোথায় এইরূপ কার্যকারণ বিশ্লেষণে বেশ নিপূণতার পরিচয় দিয়েছেন। আর কার্যকরণ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ ও বেশ গ্রহণযোগ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্যের কারণে প্রায়ই বইটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি রেফারেন্স বই এর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত প্রায় এক দশকব্যাপী।

প্রথম অধ্যায়ে তিনি তাঁর বইয়ের একটি স্কেচ তৈরি করার প্রয়াস চালিয়েছেন বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ঘটনাগুলিকে একটি সারণিতে উপস্থাপনের মাধ্যমে। বিংশ শতকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মেরুকরণ ছিল বেশ প্রকট। এক মেরুতে ছিল পুঁজিবাদ আর অন্য মেরুতে ছিল সমাজতন্ত্র। মোটাদাগে বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস লিখতে গেলে যেটা দাঁড়ায় পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ের ইতিহাস।

সামন্তবাদের ভিত্তিভূমিতে আক্রমণ করে যখন গণতন্ত্রায়ণের পথে বিশ্বের যাত্রা শুরু হল তখনই সামন্তপ্রভুদের প্রতিস্থাপন করল অর্থ। সামন্তবাদের যুগে টাকা-পয়সা ছুটত ক্ষমতা কিংবা সামন্তপ্রভুদের দিকে। এর অবসানে অর্থই হয়ে উঠল আসল প্রভু। অর্থ যার দুনিয়া তার। নতুন এক ঈশ্বরের সন্ধান পেল পৃথিবী। আর সেটা হল অর্থ। পুঞ্জীভূত অর্থ হয়ে উঠল সকল ক্ষমতা, আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতার উৎস। আর শিল্পায়নের জ্বালানি পেয়ে পুঁজিবাদ হয়ে উঠল এক দৈত্য।

পুঁজিবাদে বিরক্ত হয়ে চিন্তাবিদেরা সমাধান খুঁজলেন। চূড়ান্ত একটা স্কেচ আঁকলেন মার্কস ও এঙ্গেলস। তাঁদের স্কেচ ধরেই লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হল সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র বা শ্রমিকপ্রতিনিধিদের রাজত্ব। রাশিয়ায় সাম্যবাদ কতটুকু কার্যকর সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়ার নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছড়িয়ে দিতে চাইল দেশ-দেশান্তরে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।

পুঁজিবাদী বিশ্বও জাতীয়তাবাদের জাগরণে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। দু-দুটো মহাযুদ্ধ পুঁজিবাদের রাজধানী স্থানান্তর করল ইউরোপ থেকে আমেরিকায়। আর পুঁজিবাদী বিশ্ব একটি সাধারণ শত্রুর অস্তিত্ব বেশ প্রবলভাবেই টের পেল। আর সেটি হল সমাজতন্ত্র। অনিবার্যভাবেই বিংশ শতাব্দীতে ঘটা প্রতিটি উল্খেযোগ্য ঘটনাতেই ছিল পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বের ছাপ। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও এর ব্যতিক্রম নয়।

কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে গেলে তার সাম্যবাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। আর দেখা গেল সাম্রাজ্যবাদের নির্মম মুখচ্ছবি। আফগানিস্তানে আমরা সাম্যবাদী সোভিয়েত কে দেখি না, দেখি আগ্রাসী সোভিয়েতকে।

ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় বিশ্ব-নেতৃত্ব যুদ্ধ এড়ানোর রাস্তা খুঁজতে লাগল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন একটি আন্তর্জাতিক ফোরামের প্রস্তাব দিলেন। কাজও শুরু হল।কিন্তু লীগ অব নেশনস টিকল না। কারণ ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ক্ষমতার ভারসাম্যে বারবার আঘাত হানছিল অনিশ্চয়তার চপেটাঘাত। যুক্তরাষ্ট্রও স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থেকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যস্ত।

কিন্তু আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ অনেক অনিশ্চয়তারই অবসান ঘটাল। ঔপনিবেশিক শক্তি সব মোটামুটি ধ্বংস হয়ে গেল। শক্তিশূণ্যতা (Power Vacuum) পূরণ করল এবার আমেরিকা। বিশ্বব্যাপী সে তার সৈন্য ছড়িয়ে দিল। সমানতালে এগিয়ে এল সোভিয়েত রাশিয়া। একদিকে আমেরিকান সৈন্য অন্যদিকে রাশিয়ান সৈন্য। এই দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আর তাদের দ্বন্দ্ব পৃথিবীবাসীকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে পঞ্চাশ বছর। তারপর সোভিয়েতের পতন ঘটল। ফলাফল হল মার্কিনদের একক দাপট। একমাত্র মোড়ল হয়ে উঠল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ছত্রছায়ায় সবাই মার্কিন রাইফেলের মুখে নিরাপদে বাস করতে লাগল।

এতে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠল, কার্যকর বিরোধীদল না থাকলে সংসদ যেমন স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে আর উগ্রপন্থীদের বিস্তার শুরু হয়, তেমনি মার্কিন স্বেচ্ছাচারিতা আর উগ্র জাতীয়তাবাদ সমান তালে বিস্ফোরিত হতে লাগল। সাথে সন্ত্রাসবাদ কিংবা উগ্রবাদের জন্ম বিশ্বব্যাপী শুরু হল। তালেবান কিংবা আল কায়েদার মত হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হল।

নিঃসঙ্গতার নীতি অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র যেমন তার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল, তেমনি চীনও অর্ধশতাব্দী ধরে তার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যস্ত।

তথ্যসমৃদ্ধ এই বইয়ের একমাত্র দুর্বলতা হল ক্রস-চেক করার মত পিন-পয়েন্ট রেফারেন্স না দেয়া। তবে সহায়ক সূত্র লেখক দিয়েছেন। আর ইন্টারনেটের এই যুগে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোন তথ্য ক্রস চেক করা কঠিন কিছু না। তাই পিন-পয়েন্ট রেফারেন্স হয়তোবা নিষ্প্রয়োজন।

বইটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আগ্রহী পাঠকের প্রাইমারী লিস্টে থাকা জরুরী।

জনতার মালিকানার গল্প

20160822_183409প্রখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল  ইসলাম স্মরণে। স্থান: আর সি মজুমদার অডিটোরিয়াম। তারিখ: ২২ আগস্ট

এক দেশে ছিল কতিপয় সহজ সরল লোক। তাদের অনেক সম্পত্তি ছিল। পুরো দেশটাই ছিল সেই সরল মানুষদের। কিন্তু সেই সম্পত্তি দখল করে নিল ব্রিটিশরা। দখল করে সেই সহজ সরল লোকগুলা রে বানিয়ে ফেলল তাদের ভূমিদাস।আর ব্রিটিশরা বনে গেল প্রভু। এই প্রভুদের দাসত্ব করতে করতে কেটে গেল দুইশ বছর। তারপর তারা বুঝে গেল প্রভুদের ফাঁকি। তারা নিজের সম্পত্তি থেকে প্রভুদের সরে যেতে বলল। প্রভুরা যাওয়ার আগে বলে গেল, তোমরা পূর্ব পশ্চিম ভাই-ভাই। একসাথে মিলেমিশে থাকবা।

তারপর শুরু হল পশ্চিমের ভাইদের বাটপারি। তারা বুঝল যে, এদেরকে সম্পদের ম্যানেজারি দেয়া যাবে না। দিলে তো আর ঠকানো যাবেনা। তাই তারা বসালো বন্দুক। বন্দুকের নলের মুখে তারা ম্যানেজারি করল সিকি শতাব্দী। তারপর সহজ-সরল মানুষগুলা আর সহজ-সরল থাকল না। প্রথমে তারা বন্দুকের ভয়ে বেশ কিছুদিন চুপ করে থাকল। কিন্তু এর মধ্যে তাদের মাঝে হাজির হল একজন কবি। সে কবি যেনতেন কবি নন। রাজনীতির কবি।  কবির কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তারাও বন্দুক হাতে নিল। তারপর তাদের সম্পত্তি তাদের হাতে ফিরে  এল।

কিন্তু এবার সম্পত্তির দেখাশোনা করবে কে? এবার তো আর কেউ বন্দুক হাতে ম্যানেজারি দাবি করার মত নেই। তারা নিজেরাই ঠিক করল তাদের ম্যানেজার। আর তারপরই শুরু হল ম্যানেজারদের ছলচাতুরি। ম্যানেজার আসে, ম্যানেজার যায়। কিন্তু মূর্খ মালিকদের ঠিকই ফাঁকি দিয়ে তারা নিজেদের আখের গোছায়। কখনো বা বন্দুকের নলের মুখে কখনো বা কথার চাতুরি দিয়ে। আবার কখনো বা রাজনীতির মারপ্যাঁচে।

একবার কেউ ম্যানেজারি পেলে আর ছাড়তে চায় না। রক্তের দাগও শুকায় না। ভাল ম্যানেজারও কপালে জোটেনা।

এটা হচ্ছে একটা দেশের গল্প। সে দেশের মানুষের গল্প। আর সে দেশের সরকারের গল্প। দেশের নাম বাংলাদেশ। জনসংখ্যায় বিশ্বের অষ্টম। তোষামোদকারীরা একে একটা শ্রেণীতে ফেলে রেখেছে। তাকে নাকি বলে  এমার্জিং টাইগার্স।

দেশের  একটা সংবিধানও আছে। সংবিধানের নাম “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান”। সংবিধানে বলা আছে যে, সে দেশের মালিক জনগণ। আর জনগণের হয়ে সরকার দেশটা পরিচালনা করবে। সরকার হল উপরে বর্ণিত ম্যানেজার রা। সংবিধানে বলা আছে যে, সরকার দেশের পরিবেশ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সরকার সে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে  একটা জনবহুল জায়গায়। সরকার বলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নাকি জনগণকে সুরক্ষা দেবে। সরকারের কথায় মনে হয় ইউরেনিয়াম সরকারের তাঁবেদার।

আবার তাদের একটা বন আছে। যে বনটার কারণে দেশটাকে বিশ্বের পরিবেশবাদীরা চেনে। বনের নাম সুন্দরবন। সুন্দরবনের কাছে সরকার  একটা কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কয়লা পুড়বে, ধোঁয়া বের হবে। যে ধোঁয়া বাতাসে মিশলে আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে  এসিড পড়ে। নিন্দুকেরা বলে যে, কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জনগণের কোন লাভ হবে না। লাভ হবে কোটিপতিদের। যে কোটিপতিরা বিনিয়োগ করছে। আর জনগণ কোটিপতিদের কাছে লাখ টাকার ‍বিদ্যুৎ কোটি টাকায় কিনবে। নিন্দুকের মুখে ছাই। নিন্দুকেরা তো আর জানেনা যে, সরকার বাহাদুর একটা হুংকার ছাড়বে আর কয়লার ধোঁয়া বাতাসে না মিশে মাটিতে মিশে যাবে।

সংবিধানে কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণের কথা বলা আছে।

সে দেশের সংবিধানে কিন্তু বেঁচে থাকার অধিকারের কথা। আরও আছে সে দেশে একঝাঁক দক্ষ আইনপ্রয়োগকারী সদস্য। তাঁদের কাজ হচ্ছে সাদা পোশাকে সে দেশের মানুষেরকে বাড়ি থেকে বের করে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়া। সংবিধানে আছে বেঁচে থাকার অধিকারের কথা। আইনপ্রওয়োগকারী সংস্থা এই অধিকার দেয় মানুষকে। যাদেরকে তুলে নিয়ে যায় তাদেরকে চিরদিনের জন্য এই অধিকার দিয়ে দেয়। কারণ তাদের মরা মুখ আর পরিবারের বা পরিচিত কেউ দেখতে পায় না। তারা বেঁচে থাকে। পিতাহারা সন্তানের বুকে। স্বামীহারা স্ত্রীর বুকে। আজীবন।

সংবিধানেই আছে বেঁচে থাকার অধিকারের কথা।

সংবিধানেই আছে মিটিং-মিছিল এর স্বাধীনতার কথা। সেই দেশে আছে কিছু বঞ্চিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী। শিক্ষকরা খুব মহান। বেতন পায়না, তারপরও পড়ায়। তারা বেতনের কথা বললে পুলিশ তাদের জলকামান আর পেপার স্প্রে দিয়ে পাহারা দেয়। সুরক্ষা দেয়। তাদের কে আরও মহৎ করে তোলে। এতদিন তারা ছিল বেতন ছাড়া মাস্টার। এখন তারা বেতন ছাড়া নির্যাতিত শিক্ষক।

সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষার্থীরা বস্তিতে থাকে। বস্তিগুলোর নাম ছাত্রাবাস। এক বিশ্ববিদ্যালয় আছে সে দেশে। সেখানকার শিক্ষার্থীরা বড় ভাগ্যবান। তাদের বস্তিতে থাকতে হয় না। তাদের বেশ কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী আছে। এই শুভাকাঙ্ক্ষীদের কে তারা তাদের বস্তিগুলা দিয়ে দেয়। শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাদের সে দান গ্রহণ করে। তারা সেখানে শপিংমল বানায়। শিক্ষার্থীরা আরামসে শপিং করে। এসি করা শপিংমলগুলাতে।

কিন্তু সুখে থাকলে ভুতে কিলায়। অবস্থা এখন তাই। সে দেশে একটা কারাগার ছিল। কয়েদিদের কে মুক্ত বাতাস খাওয়ানো দরকার কিনা! তাই কয়েদিদের পাঠিয়ে দেয়া হয় নদীর ওপারে। নাদান শিক্ষার্থীরা এবার এক অদ্ভূত দাবি করে বসে। পড়াশোনা আর স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিয়ে তারা নাকি এবার কারাগারে ঢুকবে!!! কি অযৌক্তিক কথা!!! কি যে কুলাঙ্গার এরা?

যাহোক তাদের কথা আর কেউ কানে নেয় না। কিন্তু কুলাঙ্গার গুলা আরও এককাঠি সরেস। তারা রাস্তায় মিছিল বের করে। রাস্তায় চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।  এবার এগিয়ে আসেন দেশপ্রেমিক পুলিশেরা। তারা শিক্ষার্থীদের ব্যারিকেড দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা  পড়াশোনা করে কি যে শিখল! তারা ব্যারিকেডকে মনে করল বিয়েবাড়ির গেট। তারা ব্যারিকেড ভেঙ্গে  এগিয়ে গেল। অভ্যর্থনারত পুলিশ তাদেরকে লাঠিচার্জ পরিবেশন করল। লাঠিচার্জ এমন এক দামি জিনিস। এটা বেশি খাওয়া যায়না। শিক্ষার্থীরা তবু খেল। ভালই খেল। তারপর তারা ফিরে গেল। আর পুলিশও তৃপ্তির ঢেঁকুড় তুলল। লাঠিচার্জ এমন এক জিনিস যে খায় আর যে খাওয়ায় সেই  বোঝে এর মজা।

সংবিধানে নাকি মিছিল-মিটিং এর স্বাধীনতার কথা বলা আছে!

সে দেশের জনগণ বেশ অমায়িক। তারা বেশ ভাল আইন তৈরি করতে পারে। যদিও সংবিধানে বলা আছে সে দেশের পার্লামেন্ট নামক একটা ঘরের বাসিন্দা আইন তৈরি করবে। কিন্তু জনগণ নিজের তৈরি আইন মোতাবেক চলে। আর অথরিটির তৈরি আইন ভেঙে চুরমার করে। যেমন ধরেন ট্রাফিক আইন। অথরিটি বলে নির্দিষ্ট পথে চলতে হবে। কিন্তু জনতার আইন বলে ভিন্ন কথা! সুযোগ আছে তো সামনের চাক্কা আগে বাড়ো। সে ফুটপাত আর রাজপথ যাই হোক।

সে দেশে  একটা প্রথা আছে। প্রথা হল অথরিটির আইনকে যে যত বেশি বুড়ো আঙুল দেখাইতে পারে, তার প্রেস্টিজ তত বেশি। তাই সে  দেশে  আইন অমান্য করার এক প্রতিযোগিতা আছে। এই প্রতিযোগিতায় যারা এগিয়ে থাকে, তাদেরকে পথে ঘাটে, মাঠে-মঞ্চে ফুলেল শুভেচ্ছা দেয়া হয়।

সেই দেশের সংবিধানের অন্যতম আদর্শ হল গণতন্ত্র। তবে রাজ-প্রজা এখনও বিদ্যমান। তবে রাজারাও পুরুষানুক্রমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তবে তারা প্রজার ম্যানেজার হিসেবিই রাজত্ব (মন্ত্রীত্ব) বুঝে নেন। তাদের উপর প্রজাদের অাস্থা অনেক বেশি। তাই তারা খোঁজ-খবরও নেন না, ম্যানেজারি কেমন চলছে। দুই-একজন অতি-উৎসাহী মাঝে-মধ্যে খবর নেয়ার চেষ্টা করে। তাদের কে উটকো হিসেবে ধরে নেয়া হয়। কারণ যাঁরা খাঁটি প্রজা, তারা রাজার কাজকর্মে নাক গলান না। তারা রাজাদের অনুসারী। রাজাদের সাথে সাথে নিজের ও আখের গোছাতে ব্যস্তা।

আর রাজার উপর প্রজাদের এই দাপটের কারণেই সংবিধানে দেশটাকে বলা হয় প্রজাতন্ত্র।

 

14063983_10153870698452709_7376121303185182160_n
মাহমুদুল ইসলাম। ছবি: অ্যাডভোকেট মনজুর আল মতিন পিতমের ফেসবুক আইডি থেকে নেয়া।

সে দেশের সরকারদের মধ্যেও  একটা প্রতিযোগিতা আছে। প্রজাদের মত তারাও আইন অমান্য করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সরকার বাহাদুর বলে কথা! তাই তারা সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেন হামেশাই। যে সরকার যত বেশি সংবিধান অমান্য করবেন সে সরকার তত বেশি ক্ষমতাবান। আর যে সরকার সংবিধান টাকে যত বেশি মোচড়ানোর ক্ষমতা রাখে সে সরকার তত বেশি সুপারপাওয়ার।

এভাবে মোচড়াতে মোচড়াতে সংবিধান কখন যে ফৌজদারি আইন হয়ে গেছে কেউ আর খেয়াল করে নাই।

নিন্দুকেরা হামেশাই প্রশ্ন করেন, সংবিধান নাড়াচাড়া করে আইন-বিভাগ আর বিচার বিচার বিভাগ। তাইলে সরকারের সাথে সাথে সংবিধান চেঞ্জ হয় ক্যামনে? নিন্দুকেরা এক ইউটোপিয়ান জগতে বাস করেন। তারা জানেন না, সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ নামে একটা অনুচ্ছেদ আছে। জানা থাকলেও তারা সেটা মানতে পারেন না। তারা খালি ঘোড়া ডিঙায় ঘাস খায়। তারা শুধু ৭৭ সাতাত্তর বলে চিল্লায়। তারা কয় ন্যায়পাল কই? খালি তার ন্যায়পালরেই খুঁজে। তারা জানেওনা যে, ন্যায়পাল হল কাজির গরু। কিতাবে আছে গোয়ালে নাই। তাই সরকার তাদের কথায় কান দেয় না।

জয় সরকার বাহাদুর!!!! জয় ঘুমন্ত জনতা। তাারা জানেনা যে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা তাদের মৌলিক অধিকার ই নয়।

বিঃদ্রঃ এই নিন্দুকদের অন্যতম হচ্ছেন মাহমুদুল  ইসলাম। লোকে বলে তাঁর জন্ম নাকি এদেশে হওয়া ‍উচিৎ হয়নাই। তিনি জীবদ্দশায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে অপছন্দ করতেন। তবে তিনি একখান বই লিখেছেন সংবিধানের উপরে। বইয়ের নাম “কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ”। তার বই নাকি এখন প্রতিদিন পড়া হয়। তার বইয়ের রেফারেন্স নাকি চূড়ান্ত অথরিটি। নিন্দুকেরা এখন তার বই সাথে নিয়ে আইন আদালত করে বেড়ান।

 

তার চেয়ে বিতার্কিক রা একদিকে অনেক গুণ এগিয়ে আছেন। অন্তত ঃ মার্জিত আচরণের দিক থেকে।

 

ধান ভানতে শিবের গীতের অবতারণা অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য লাগছে জানি।  বলসছিলাম যে, এইসব সাজানো নাটক আর অন্যান্য হুংকারের মাঝে আজ আমরা একটা বড় ধরণের সিভিল রাইট হারাতে বসেছি। আর সেটা হল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

আসলে যে শাসকগোষ্ঠী র নৈতিক ভিত্তি টা থাকে নড়বড়ে তারা বরাবরই মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে থাকে।  আর এখানেই থমকে থাকে প্রগতি। কিভাবে? থাক আর একদিন সময় হলেই লেখা যাবে। কন্সেপ্ট টা যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা।

সুশান্ত পাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: একটি মানবিক আবেদন

আমি জানি আমি যেটা বলতে চাচ্ছি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে আমার সহপাঠী কারও পক্ষেই এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু তারপরও আমাকে বলতেই হবে। না বলে থাকতে পারছি না। কারণ আমি বলব হিউম্যানিটারিয়ান আসপেক্ট থেকে। একজন অসহায় মানুষের উপর আমার মনে হয় বেশিই করা হচ্ছে। আপনারা হয়তোবা বুঝতে পারছেন আমি সুশান্ত পালের সাফাই গাইতে আসছি। হ্যাঁ, আমি সুশান্ত পালেরই সাফাই গাইতে আসছি। আমি রিঅ্যাকশন সম্পর্কে সচেতন আছি।

 

আচ্ছা, শুরু থেকেই বলি, সুশান্ত পাল কে? তার পরিচয় তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা। কিভাবে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা হলেন? বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়ে। তিনি কি একাই বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? অবশ্যই না। তাইলে সে কেমনে এইভাবে লাইমলাইটে আসল? উত্তর টা আমাদের নিজেদের মধ্যেই খুঁজার চেষ্টা করি। কি পেলেন তো? আমরাই আমাদের মধ্যে সুশান্তের একটা কাল্ট তৈরি করে নিয়েছিলাম।

 

sushanta-paul
সুশান্ত পালরা একদিনে সেলিব্রেটি হয়ে ওঠেনা। এর পেছনে কাজ করে আমাদের মানসিক দৈন্য। ছবি: গুগল সার্চ েইঞ্জিন

মানলাম, সুশান্ত একজন ফেইমসীকার। হ্যাঁ, মিডিয়া তাকে সেই কাভারেজ ও দিছিল। কিন্তু তার কাল্ট তৈরি করল কে? আমরা কি তাকে সচেতনভাবে অতিমানবীয় কোন জায়গায় স্থান দিই নাই? ৩০ তম বিসিএসের সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় কে হয়েছিল? আপনি জানেন? আমি জানিনা। কেন জানিনা? সুশান্তর চেয়ে তার পার্থক্য খুব বেশি? সুশান্ত যদি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার কারণে বিখ্যাত হয়ে থাকে, তাহলে পাশের রুমের নাসির ভাই আর রুমমেট মাসুম ভাই কি দোষ করছে? মেধাতালিকার শীর্ষে থাকার কারণে যদি সুশান্ত খ্যাতির চূড়ায় উঠে যেতে পারে, তাহলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ইউনিটে প্রতিবছর চার জন এবং বিসিএস এর সম্মিলিত/ক্যাডারভিত্তিক মেধাতালিকায় ঢাবি’র ভাইদের কে আমরা সেভাবে মূল্যায়ণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি কেন?

 

কেউ হয়তোবা উত্তর দেবেন যে, ঢাবি’র হেজিমনি তে সে আঘাত করছে বলেই সে শুরু থেকেই খ্যাতির চূড়ায়। হয়তোবা। হ্যাটট্রিক করা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন কে হারিয়ে যদি কেউ চ্যাম্পিয়ন হয় তাহলে সে একটু বেশিই খ্যাতি পাবে।

 

কিন্তু সুশান্তর এই সেলিব্রেটি হয়ে ওঠার পেছনে কি আমাদের কোন হাত নেই? আপনি কি এতটাই শিওর? ৩৪ তম’র ৩৪ টোটকা কি আপনি মনোযোগ দিয়ে পড়েন নাই? না পড়লে ঠিক আছে। পড়লেও ঠিক আছে। কোন সমস্যা নাই। কিন্তু সমস্যা হয় অন্য কোথাও। সমস্যা হয় যখন প্রথম শ্রেণির একজন আমলা কে আমরা প্রথম শ্রেণির একজন সেলিব্রেটি হিসেবে স্থান দিই। এক্ষেত্রে ব্যাপারটার একটা বাণিজ্যিক মূল্যও আছে। কোচিং সেন্টার, ক্যারিয়ার সেন্টার রা তো এদেরকে দিয়েই ব্যবসা করে। আর তারা ব্যবসা করার সুযোগ ক্যামনে পায়? কারণ তাদের প্রতি আমাদের একটা দুর্বলতা থেকেই যায়। ও দাদা তো ফার্স্ট হইছে, দাদার কাছেই টিপস নিতে হইব। টিপস না নিলে আমি ক্যামনে ক্যাডার হমু? দাদা কোন ক্যাডারটা ফার্স্ট চয়েজ দেয়া যায় বলেন তো? দাদা, কোন বইটা পড়লে সহজে ক্যাডার হওয়া যাবে? দাদা, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য কত ঘন্টা পড়তে হবে? দাদা আমি তো ইংলিশে পড়ি, আমি কি ইকোনমিক ক্যাডার হইতে পারব?

 

তখন দাদারাও মাইক হাতে বেশ গর্বের সুরে বলার সাহস পান। আমি হেন করেছিলাম। জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বিসিএস বানাইছিলাম। আমি জানতাম আমি ৮৭ তম বিসিএসে ফার্স্ট হতে যাচ্ছি। ২.৭৩ নিয়া আই.বি.এ তে চান্স পাইছিলাম। কানেক্টিং দ্য ডটস.. এটসেট্রা এন্ড এটসেট্রা……..

এবার ঘটনায় আসি, (দাদার ভাষ্যমতে) তিনি র‌্যাগিং এর বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে কতগুলো বানোয়াট এবং উদ্ভট কথাবার্তা বলেছেন। হয়তোবা তিনি এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছেন। কারণ ধরেই নিতে পারি যে, পরপর দুই বার টিএসসির অপমান তিনি সহ্য করতে পারেন নি।

 

আমাদের ইগোতে লাগল খুব। খুবই স্বাভাবিক। আমরা যথাসম্ভব ওয়েতে প্রতিবাদ জানালাম। প্রতিবাদ তার কানে গেল। তিনি এডিট করলেন, কিন্তু আমাদের হুংকার থামল না। তিনি পোস্ট ডিলিট করলেন। তারপর ক্ষমাও চাইলেন। আর একবার খেয়াল করুন, তিনি যে প্লাটফর্মে (ফেসবুকে) ঢাবিকে অপমান করেছেন, সেই একই প্লাটফর্মে এসে সেটার জন্য ক্ষমাও চাইলেন।

 

এবার আমাদের কি করা উচিৎ? আহত হিসেবে আমাদের কাছে তার ক্ষমা প্রার্থনা হাস্যকর মনে হতে পারে। সুশান্তের অপরাধ কি? আমাদের সম্মানে আঘাত দিছে, প্রতিকার কি? আমাদের সম্মান পুনরুদ্ধার করা। উপায় কি? ব্যাটারে ক্ষমা চাইতে হবে? তিনি তো সেটা করেছেনই। এরপর আর কি করা যেতে পারে?

 

এরপর আরও অনেক কিছুই করা যেতে পারে। আমরা জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসাথে গর্জে উঠলে দোর্দন্ড প্রতাপশালী সামরিক সরকারের ভিত পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গর্জে উঠলে আইউব খান, এইচ. এম. এরশাদ, ফখরুদ্দিন, মঈন উদ্দীন দের গদি নড়বড়ে হয়ে ওঠে। আর সুশান্ত সে তো কোন ছাড়!!!! এখন চিন্তা করে দেখুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশান্তের নামে মানববন্ধন করা কি মশা মারতে কামান দাগানোর মত নয়?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি চায়, সুশান্তর চাকুরির বারটা পর্যন্ত বাজায় দিতে পারে। কিন্তু সেটা করা কতটুকু নৈতিক হবে? সুশান্ত যদি ঘাউরামো করতো তাও একটা ব্যাপার ছিল। সেতো নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছেই। তার ব্যাপারে কঠোর হওয়ায় আমার মোরালিটি তে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করছি না। কেন করছিনা? কারণ ব্যাটা এখন অসহায়। এমনিতেই তার হাতে হারিকেন উঠেই গেছে। আর তার …… য় বাঁশ দেয়া কি খুব জরুরী?

 

আর যাঁরা এখন সুশান্ত’র নৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আপনাদের (বিশেষত আপুদের) বলব, আপনারা অনেক সরল বিশ্বাসে সুশান্তের কাছে পরামর্শ নিতে গেছিলেন জানি, হয়তোবা অনেকেই খুব একটা এক্সপেক্টেড বিহেভিয়র পান নাই। ঠিক আছে, বেচারারে মাফ করে দিন। আর যদি আপনারা সত্যিকারার্থেই সাবস্ট্যানশিয়ালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে বিচার-ব্যবস্থার শরণাপন্ন হতে পারেন। আশা করছি, আপনারা আইনি সহযোগিতা পাবেন। কারণ সহযোগিতা তারাই পান, যাঁদের এটা দরকার।

 

একবার ভাবুন, প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় কারা? আর ক্ষমা করে কে? দুর্বল রাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়, আর শক্তিশালীরা হয় ক্ষমাপরায়ণ? আমরা ঢাবিয়ান রা কি ক্ষমা করতে পারি না? আমাদের মাঝে কি সিমপ্যাথি কাজ করেনা? নাকি সুশান্তের প্রতি আমাদেরও এলার্জি আছে? তার তারকাখ্যাতির ব্যাপারে এলার্জি? আশা করব, সুশান্তর পরিস্থিতিটাকে মানবিক দিক দিয়ে বিবেচনা করার মত উদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আচ্ছা, সুশান্তর ব্যাপারে উদার না হোন, প্রগতির এই লালনভূমিতে আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতাটুকু সম্মান পাবে এইটুকু আশা করতেই পারি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: মিথ এবং বাস্তবতা ১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি অনেক গর্বিত। কারণ একমাত্র এই একটা বিশ্ববিদ্যালয়েরই আছে একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস যা বাঙালির ১০০ বছরের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে।

du-daily-sun
ঢাবি’র ইতিহাস ঐতিহ্য শুধু ঢাবিকেই আন্দোলিত করে না। এটি সারা বাংলার মানুষকে শোনায় অনুপ্রেরণার গল্প। ছবি: ডেইলি সান।

আসুন এবার ঢাবি’র কিছু সীমাবদ্ধতার কথা ভাবি। এখনও ঢাবি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি বিসিএস ক্যাডার তৈরি করছে কারণ কি জানেন? কারণ উচ্চমাধ্যমিকের পর সেরা মেধাবীরা এখানেই এসে ভীড় করে। অন্য কোন পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও ঢাবিতে এটা অপছন্দের বিষয়েও ভর্তি হয় কারণ এটা ঢাবি বলে।

কিন্তু ঢাবি এই মেধাবীদের কি দিচ্ছে যেটা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিচ্ছেনা? আমার মনে হয় যা দিচ্ছে সেটা হল কেবলমাত্র “উন্নাসিক মনোভাব, আর অতীত নিয়ে একধরণের ঢেঁকুড়”।

ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে কথা বলি। একটা জরিপ চালান, দেখবেন ঢাবি’র পরিবেশ থাকবে শেষ ২৫ শতাংশে। বাংলাদেশে আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় পাবেন না, যেখানে দিনের বেলা শিক্ষার্থীরা ক্লাশ করে আর রাতের বেলা গাঁজার আসর বসে। আমি জানিনা, পৃথিবীর আর  কোন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সিটি কর্পোরেশনের ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিনা।

শব্দদূষণের কথা বলি, শব্দদূষণের কারণে আমাদের সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের অনেকেই এখন শাবিপ্রবির মত নীরব ক্যাম্পাসে গিয়ে থাকতে পারেন না। নীরবতায় নাকি তার দমবন্ধ হয়ে আসে। এক একটা জাতীয় দিবসের সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে বের হলে মনে হয় কোন ডাস্টবিনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।

ক্যান্টিন/মেসের কথা বলি, ঢাবি’র ক্যান্টিন/মেসের খাবার খেয়ে ঢাবি’র শিক্ষার্থীরা বেঁচে আছে কেমনে জানেন? কারণ ঢাবি’র অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। আর এই মানুষগুলার থাকে অসম্ভব রকমের মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা। এঁদেরকে যদি একটা বস্তির মধ্যে নিয়ে গিয়ে “অরিজিন অব স্পিসিস” পড়তে দেন, এরা পড়তে পারবে। কারণ এরা যে কোন সিচুয়েশনেই পড়াশোনা করতে পারে।

এরপর আসি আবাসন ব্যবস্থায়, এত্তগুলা বাস, হল থাকার পরও কেন একটা ছেলেকে গণরুমে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টানা একবছর, এটা একটা গবেষণার বিষয়। আর ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে, আমরা পুরো জিনিসটাকে সিস্টেম বলে মেনে নিছি। আমাদের  গণরুমে থাকতে কষ্ট হয় না, বরং আমরা গণরুমের বন্ধুদের আজীবন মিস করি। কেন গণরুমের বন্ধুদের আজীবন মিস করি জানেন? কারণ গণরুমের মেট রা হল আমাদের সমব্যথী, আমাদের দুর্দিনের বন্ধু। আর আপনারা হয়তোবা জানেন, বুদ্ধদেব গুহ একটা কথা বলেছিলেন, শিকারের সময় জঙ্গলে আর যুদ্ধক্ষেত্রে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সে বন্ধুত্ব সত্যিই অমলিন।

sm-hall-daily-star
এভাবেই কেটে যায় শিক্ষার্থীদের মাস বছর এমনকি পুরো ইউনিভার্সিটি লাইফ। প্রশাসন নির্বিকার। নাকি অসহায়? তবে কেন? ছবি: ডেইলি স্টার।

আসি ক্লাশরুমে, একথাটা আমাদের মানতেই হবে, আমাদের দেশের সময়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছেই আমরা শিখি। কিন্তু ক’জন শিক্ষক এখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেদের ছাপ রেখে যেতে পারছেন? শিক্ষকরা এখানে পড়ানোর জন্য আসেন নাকি লাল, নীল, হলুদ, সাদা রঙে রঞ্জিত হতে আসেন জানিনা। ক’জন শিক্ষকের মধ্যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা দেখেছেন? তাঁরা মাঝে-মধ্যে আবাসিক হলগুলোতে আসেন বটে, আমাদের সমস্যা শুনতে নয়, তাঁরা আসেন পার্ট নিতে।

লাইব্রেরির কথা বলি। লাইব্রেরি যেখানে দুর্লভ পুরাতন বইয়ের সংগ্রহশালা হতে পারত, সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ “অপ্রয়োজনীয়” বইপত্র বিক্রি করে দেয় কেজি-তে। গতকালকে মাহবুবুল আলমের একটা লেখায় পড়লাম, মধ্যযুগের হাতে লেখা অনেক পান্ডুলিপিরই পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় নি, যেগুলো উদ্ধার করতে পারলে হয়তোবা মধ্যযুগীয় ইতিহাস-সাহিত্যের অনেক অজানা দিগন্ত উন্মোচিত হত। আর সেগুলো সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি/ সংগ্রহশালায়। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ যেগুলা বিক্রি করতে চাইছিলেন, সেগুলার মধ্যে এ-রকম কোন মূল্যবান দলিলপত্র থাকার সম্ভাবনা কি একেবারেই নেই?

লাইব্রেরির কথা আসলেই বলতে হয়, লাইব্রেরিতে পড়াশোনার পরিবেশের কথা। এখানে অনেকেই আসেন ক্লাশের পড়া তৈরি করতে। অনেকেই আসেন চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিতে। ভাল। কিন্তু কেউই এখানে সংগ্রহশালার বই নেন না। সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে বই নিয়ে আসেন। যা নিয়ে আসেন সেগুলা অধিকাংশই চাকরী-প্রত্যাশীদের গাইড বই। সমস্যা সেখানে না। সমস্যা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও পড়াশোনার পরিবেশ নেই। আর একারণেই সবাই হোমওয়ার্ক করতে আসেন লাইব্রেরিতে। আর এতে যে ভীড় টা তৈরি হয়, তাতে লাইব্রেরিতে পড়াশোনার পরিবেশ টা বিঘ্নিত হয়। আপনি দুপুর বেলা গিয়ে আপনার লাইব্রেরি কার্ড টা দিয়ে একটা বই ইস্যু করে পড়বেন, বসার কোন জায়গা পাবেন না। কারণ, সবাই সেখানে চাকরির প্রিপারেশন নিচ্ছেন।

গেস্টরুমের কথা বলি, গেস্টরুমে যে খুব খারাপ কিছু হয়, সেটা বলব না। তবে কিছু উচ্ছৃংখল সিনিয়রের আচরণে যে, কচি-কাঁচারা আহত হন না, এটা বলা মুশকিল। তবে গেস্ট-রুমের ফলে সিনিয়র-জুনিয়র আন্ডারস্ট্যান্ডিং টা অনেক ক্ষেত্রে বাড়ে, যেটায় ছোট ভাইরা আশ্রয় খোঁজে। সত্যি কথা হল, ক্যাম্পাসে এসে যখন ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে কোথাও আর আশ্রয় খুঁজে পায়না, তখন সে গেস্টরুমকেই আশ্রয় হিসেবে নেয়। এটা কতবড় দৈন্যের পরিচায়ক ভেবে দেখেছেন?

পন্ডিত জওহর লাল নেহরুর  একটি বিখ্যাত উক্তি হল “কোন দেশকে যদি জানতে বা বুঝতে চাও তাহলে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একবার  ঘুরে আস”। কথাটা  যদি বাংলাদেশ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে ধরা যায়, তাহলে বলতে হয়, “অতীতে যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের দ্রোহের প্রতীক বলা যায়, তাহলে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মূল্যবোধহীনতা আর বিশৃঙ্খলার প্রতীক”।

সবশেষে একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করছি, প্রথম বর্ষের নবীন-বরণে এসে স্যারেরা বললেন, যে কোন সমস্যায় এসে স্যারদের সাথে কথা বলবা। আমি গেলাম, বললাম, স্যার হলে থাকতে খুব সমস্যা হচ্ছে। স্যার বললেন, ওটা হলের ব্যাপার আমরা ডিপার্টমেন্ট থেকে হলের ব্যাপারে মাথা ঘামাই না। আর কিছু?

একটা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর আর কি-ই বা থাকতে পারে?

আমার ব্লগ: আনাড়ির পথচলা

riding-bicycle-at-night
হাঁটি  হাঁটি পা পা করে একদিন আমিও হয়ে উঠব একজন ব্ল………গার। ব্লগার হতে পয়সা লাগে?

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষে আরিফ ভাই (আইন বিভাগ, ৩৫ তম ব্যাচ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) আমাকে বললেন ব্লগ পড়তে আর পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পড়তে। উপসম্পাদকীয় কি তা তো বুঝলাম। কিন্তু ব্লগ টা আবার কি? তারপর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হল ব্লগার হত্যার এক তান্ডব। আজ অমুক ব্লগার খুন তো কাল তমুক ব্লগার চিঠি পেলেন। বড় ভয়ংকর জিনিস তো এই ব্লগ!

তারপর বুঝলাম, ব্লগ আসলে মতামত প্রকাশের একটা প্লাটফর্ম। একটা সময় লেখকদের মতামত প্রকাশ অনেকটা সম্পাদক-প্রকাশকদের মর্জির উপর নির্ভর করত। তারা আপনা্র লেখা চাইলে প্রকাশ করতে পারেন। আবার নাও পারেন। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা ভিন্ন। এখানে টেকনোলজির সহায়তায় আপনি নিজেই তিনটা ভুমিকা পালন করতে পারছেন। লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক সব। সো এখন আপনার আওয়াজ অন্যের কাছে পৌঁছানোর জন্য আর সম্পাদক-প্রকাশকের হাতে থাকা মাইকের প্রয়োজন হচ্ছে না। সো, এখানে লেখার সময় আপনাকে কারও মনোরঞ্জনের চিন্তা করতে হচ্ছে না। আপনি  সানন্দে  যা ইচ্ছা লিখতে পারেন। দারুণ জিনিসতো এই ব্লগ!

দুম করে খুলেই ফেললাম একটা ব্লগ। আনাড়ির হাতে যা হয় আর কি? কিছুই হলনা। আবার কিছুদিনের মধ্যে ভুলেই গেলাম যে ওয়ার্ডপ্রেসে আমার একটা নিজস্ব ব্লগ আছে।

কোন এক ছুটির দিনে ল্যাপটপ খুলে বসলাম। মাহদী ভাই ( ৩৬ তম ব্যাচ আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এর একটা অসাধারণ ব্লগ আছে। মাহদী ভাই একজন ইন্টেলেকচুয়াল নেতা মানুষ। মানুষকে প্রভাবিত করার অসাধারণ ক্ষমতা ওনার। না হলে কি আর ঢাকা ইউনিভার্সিটি মুট কোর্ট সোসাইটি কে এত সুন্দর ভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন! সেটা কথা না, কথা হচ্ছে ভাই লেখেন ভাল, ঘুরাঘুরি করেন অনেক। ব্লগে ওনার ঘুরাঘুরির অনেক নিদর্শন পেলাম। উনি যে একজন পন্ডিত মানুষ তা আরও ভালভাবে জানলাম। ভাল লাগল। ভাবলাম ওনার মত তো আর হওয়া সম্ভব না।

তো ওনার মত আমাকে হতে হবে কেন? আমি তো আমার মত। তিনি শিব গড়তে গিয়ে শিবই গড়েন। আর আমি শিব গড়তে বাঁদর গড়ি। তো বাদরই সই! আমি বাঁদরই গড়ব।

গেলাম ওয়ার্ডপ্রেসে। ই-মেইল চায়। দিলাম। অ্যাক্সেপ্ট করে না। কয় কি আমার ই-মেইলে নাকি একটা ব্লগ খোলা আছে! হায় হায় কয় কি? তারপর আর কি, বুঝলাম এই কাম পৃথিবীতে একজন-ই করবার পারে। আর সেটা হল আমি নিজে। তো ভালই হল। বিয়ে করতে গিয়ে দেখি বউ আমার সাথে!

ব্যাপার না। আমার শিল্প রুচি বন্ধুমহলে বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও আনাড়ির মত  একটু আধটু এডিট করলাম আর কি! যা মনে হইল করলাম। শেষে দেখি আমারে কয়, আপনে  অহনও কিচ্ছু লেখেন নাই, কিছু লিখবেন নি? আমি ভাবলাম লে হালুয়া! আবার কি লিখব? তারপর নিজেরে কইলাম আরে ব্যাটা লেখবারই  যদি না পারস তাইলে ব্লগ খুলছস ক্যা ন বে?

লেখা শুরু করলাম। লিখতে লিখতে  এই দাঁড়াইল। নিন্দুকেরা বলবেন, লেখা না ছাই! কনসেপ্ট নাই, ভাষার মাধুর্য নাই, ব্যাপক গুরুচন্ডালী দোষে দুষ্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি।

নিন্দুকের মুখে ছাই। আমার ব্লগ, আমার প্লাটফর্ম, যা খুশি লিখছি। তাতে তোমার কি হে সোনা?  ভাল লাগে নাই গিয়ে মুড়ি খাওগে যাও। কানের কাছে প্যানপ্যান শুনতে ভাল লাগেনা।

আবার ভাবি, এইরকম ডেসপ্যারেট  ছিলেন বলেই তো অভিজিৎ রায় কে বাঙালি দিনের আলোয় কোপায় মারল। যাক গে, এত চিন্তা করে কাজ নাই। রাখে আল্লাহ মারে কে? (হুম, দিনশেষে আমি একজন বাঙালিই বটে, মানে ঠেলায় পড়লে আল্লাহর নাম সবার আগে। আর হইলে খবর নাই।)

তারপরও দিন শেষে একটা কথাই ভাবতে হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর সুযোগ থাকলেই কি গালাগালি করতে হবে? যৌক্তিকতা বোঝানো কি এতই কঠিন?

অথবা ক্ষমতা থাকলেই একজন কে মেরে ফেলতে হবে? জীবন কেড়ে নেয়া খুব সহজ। কিন্তু জীবন দেয়া? পারবেন যে মানুষটাকে মেরে ফেললেন তার দেহে প্রাণের সঞ্চার করতে? কোনদিনও পারবেন না। তাই কাউকে অপমান করার আগে, কাউকে মারার আগে একবার ভাবুন। কতটা অযৌক্তিক, অমানবিক চিন্তা-চেতনার দ্বারা আমরা তাড়িত হচ্ছি!

কিছু বস্তাপচা নীতিকথা মেনে চলা আমাদের খুব দরকার।

ওয়াও! প্রায় ৬০০ শব্দের  একটা ব্লগ লিখে ফেলছি! যাক, শুরুটা নেহায়েত মন্দ না। আমার বিবেচনায় আর কি! কে কি মূল্যায়ণ করল তাতে কি আসে যায়? মনের কথা গুলো লিখব। এখানেই। আজ থাক।