ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: মিথ এবং বাস্তবতা ১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি অনেক গর্বিত। কারণ একমাত্র এই একটা বিশ্ববিদ্যালয়েরই আছে একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস যা বাঙালির ১০০ বছরের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে।

du-daily-sun
ঢাবি’র ইতিহাস ঐতিহ্য শুধু ঢাবিকেই আন্দোলিত করে না। এটি সারা বাংলার মানুষকে শোনায় অনুপ্রেরণার গল্প। ছবি: ডেইলি সান।

আসুন এবার ঢাবি’র কিছু সীমাবদ্ধতার কথা ভাবি। এখনও ঢাবি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি বিসিএস ক্যাডার তৈরি করছে কারণ কি জানেন? কারণ উচ্চমাধ্যমিকের পর সেরা মেধাবীরা এখানেই এসে ভীড় করে। অন্য কোন পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও ঢাবিতে এটা অপছন্দের বিষয়েও ভর্তি হয় কারণ এটা ঢাবি বলে।

কিন্তু ঢাবি এই মেধাবীদের কি দিচ্ছে যেটা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিচ্ছেনা? আমার মনে হয় যা দিচ্ছে সেটা হল কেবলমাত্র “উন্নাসিক মনোভাব, আর অতীত নিয়ে একধরণের ঢেঁকুড়”।

ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে কথা বলি। একটা জরিপ চালান, দেখবেন ঢাবি’র পরিবেশ থাকবে শেষ ২৫ শতাংশে। বাংলাদেশে আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় পাবেন না, যেখানে দিনের বেলা শিক্ষার্থীরা ক্লাশ করে আর রাতের বেলা গাঁজার আসর বসে। আমি জানিনা, পৃথিবীর আর  কোন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সিটি কর্পোরেশনের ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিনা।

শব্দদূষণের কথা বলি, শব্দদূষণের কারণে আমাদের সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের অনেকেই এখন শাবিপ্রবির মত নীরব ক্যাম্পাসে গিয়ে থাকতে পারেন না। নীরবতায় নাকি তার দমবন্ধ হয়ে আসে। এক একটা জাতীয় দিবসের সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে বের হলে মনে হয় কোন ডাস্টবিনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।

ক্যান্টিন/মেসের কথা বলি, ঢাবি’র ক্যান্টিন/মেসের খাবার খেয়ে ঢাবি’র শিক্ষার্থীরা বেঁচে আছে কেমনে জানেন? কারণ ঢাবি’র অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। আর এই মানুষগুলার থাকে অসম্ভব রকমের মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা। এঁদেরকে যদি একটা বস্তির মধ্যে নিয়ে গিয়ে “অরিজিন অব স্পিসিস” পড়তে দেন, এরা পড়তে পারবে। কারণ এরা যে কোন সিচুয়েশনেই পড়াশোনা করতে পারে।

এরপর আসি আবাসন ব্যবস্থায়, এত্তগুলা বাস, হল থাকার পরও কেন একটা ছেলেকে গণরুমে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টানা একবছর, এটা একটা গবেষণার বিষয়। আর ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে, আমরা পুরো জিনিসটাকে সিস্টেম বলে মেনে নিছি। আমাদের  গণরুমে থাকতে কষ্ট হয় না, বরং আমরা গণরুমের বন্ধুদের আজীবন মিস করি। কেন গণরুমের বন্ধুদের আজীবন মিস করি জানেন? কারণ গণরুমের মেট রা হল আমাদের সমব্যথী, আমাদের দুর্দিনের বন্ধু। আর আপনারা হয়তোবা জানেন, বুদ্ধদেব গুহ একটা কথা বলেছিলেন, শিকারের সময় জঙ্গলে আর যুদ্ধক্ষেত্রে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সে বন্ধুত্ব সত্যিই অমলিন।

sm-hall-daily-star
এভাবেই কেটে যায় শিক্ষার্থীদের মাস বছর এমনকি পুরো ইউনিভার্সিটি লাইফ। প্রশাসন নির্বিকার। নাকি অসহায়? তবে কেন? ছবি: ডেইলি স্টার।

আসি ক্লাশরুমে, একথাটা আমাদের মানতেই হবে, আমাদের দেশের সময়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছেই আমরা শিখি। কিন্তু ক’জন শিক্ষক এখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেদের ছাপ রেখে যেতে পারছেন? শিক্ষকরা এখানে পড়ানোর জন্য আসেন নাকি লাল, নীল, হলুদ, সাদা রঙে রঞ্জিত হতে আসেন জানিনা। ক’জন শিক্ষকের মধ্যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা দেখেছেন? তাঁরা মাঝে-মধ্যে আবাসিক হলগুলোতে আসেন বটে, আমাদের সমস্যা শুনতে নয়, তাঁরা আসেন পার্ট নিতে।

লাইব্রেরির কথা বলি। লাইব্রেরি যেখানে দুর্লভ পুরাতন বইয়ের সংগ্রহশালা হতে পারত, সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ “অপ্রয়োজনীয়” বইপত্র বিক্রি করে দেয় কেজি-তে। গতকালকে মাহবুবুল আলমের একটা লেখায় পড়লাম, মধ্যযুগের হাতে লেখা অনেক পান্ডুলিপিরই পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় নি, যেগুলো উদ্ধার করতে পারলে হয়তোবা মধ্যযুগীয় ইতিহাস-সাহিত্যের অনেক অজানা দিগন্ত উন্মোচিত হত। আর সেগুলো সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি/ সংগ্রহশালায়। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ যেগুলা বিক্রি করতে চাইছিলেন, সেগুলার মধ্যে এ-রকম কোন মূল্যবান দলিলপত্র থাকার সম্ভাবনা কি একেবারেই নেই?

লাইব্রেরির কথা আসলেই বলতে হয়, লাইব্রেরিতে পড়াশোনার পরিবেশের কথা। এখানে অনেকেই আসেন ক্লাশের পড়া তৈরি করতে। অনেকেই আসেন চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিতে। ভাল। কিন্তু কেউই এখানে সংগ্রহশালার বই নেন না। সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে বই নিয়ে আসেন। যা নিয়ে আসেন সেগুলা অধিকাংশই চাকরী-প্রত্যাশীদের গাইড বই। সমস্যা সেখানে না। সমস্যা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও পড়াশোনার পরিবেশ নেই। আর একারণেই সবাই হোমওয়ার্ক করতে আসেন লাইব্রেরিতে। আর এতে যে ভীড় টা তৈরি হয়, তাতে লাইব্রেরিতে পড়াশোনার পরিবেশ টা বিঘ্নিত হয়। আপনি দুপুর বেলা গিয়ে আপনার লাইব্রেরি কার্ড টা দিয়ে একটা বই ইস্যু করে পড়বেন, বসার কোন জায়গা পাবেন না। কারণ, সবাই সেখানে চাকরির প্রিপারেশন নিচ্ছেন।

গেস্টরুমের কথা বলি, গেস্টরুমে যে খুব খারাপ কিছু হয়, সেটা বলব না। তবে কিছু উচ্ছৃংখল সিনিয়রের আচরণে যে, কচি-কাঁচারা আহত হন না, এটা বলা মুশকিল। তবে গেস্ট-রুমের ফলে সিনিয়র-জুনিয়র আন্ডারস্ট্যান্ডিং টা অনেক ক্ষেত্রে বাড়ে, যেটায় ছোট ভাইরা আশ্রয় খোঁজে। সত্যি কথা হল, ক্যাম্পাসে এসে যখন ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে কোথাও আর আশ্রয় খুঁজে পায়না, তখন সে গেস্টরুমকেই আশ্রয় হিসেবে নেয়। এটা কতবড় দৈন্যের পরিচায়ক ভেবে দেখেছেন?

পন্ডিত জওহর লাল নেহরুর  একটি বিখ্যাত উক্তি হল “কোন দেশকে যদি জানতে বা বুঝতে চাও তাহলে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একবার  ঘুরে আস”। কথাটা  যদি বাংলাদেশ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে ধরা যায়, তাহলে বলতে হয়, “অতীতে যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের দ্রোহের প্রতীক বলা যায়, তাহলে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মূল্যবোধহীনতা আর বিশৃঙ্খলার প্রতীক”।

সবশেষে একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করছি, প্রথম বর্ষের নবীন-বরণে এসে স্যারেরা বললেন, যে কোন সমস্যায় এসে স্যারদের সাথে কথা বলবা। আমি গেলাম, বললাম, স্যার হলে থাকতে খুব সমস্যা হচ্ছে। স্যার বললেন, ওটা হলের ব্যাপার আমরা ডিপার্টমেন্ট থেকে হলের ব্যাপারে মাথা ঘামাই না। আর কিছু?

একটা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর আর কি-ই বা থাকতে পারে?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s