সুশান্ত পাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: একটি মানবিক আবেদন

আমি জানি আমি যেটা বলতে চাচ্ছি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে আমার সহপাঠী কারও পক্ষেই এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু তারপরও আমাকে বলতেই হবে। না বলে থাকতে পারছি না। কারণ আমি বলব হিউম্যানিটারিয়ান আসপেক্ট থেকে। একজন অসহায় মানুষের উপর আমার মনে হয় বেশিই করা হচ্ছে। আপনারা হয়তোবা বুঝতে পারছেন আমি সুশান্ত পালের সাফাই গাইতে আসছি। হ্যাঁ, আমি সুশান্ত পালেরই সাফাই গাইতে আসছি। আমি রিঅ্যাকশন সম্পর্কে সচেতন আছি।

 

আচ্ছা, শুরু থেকেই বলি, সুশান্ত পাল কে? তার পরিচয় তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা। কিভাবে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা হলেন? বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়ে। তিনি কি একাই বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? অবশ্যই না। তাইলে সে কেমনে এইভাবে লাইমলাইটে আসল? উত্তর টা আমাদের নিজেদের মধ্যেই খুঁজার চেষ্টা করি। কি পেলেন তো? আমরাই আমাদের মধ্যে সুশান্তের একটা কাল্ট তৈরি করে নিয়েছিলাম।

 

sushanta-paul
সুশান্ত পালরা একদিনে সেলিব্রেটি হয়ে ওঠেনা। এর পেছনে কাজ করে আমাদের মানসিক দৈন্য। ছবি: গুগল সার্চ েইঞ্জিন

মানলাম, সুশান্ত একজন ফেইমসীকার। হ্যাঁ, মিডিয়া তাকে সেই কাভারেজ ও দিছিল। কিন্তু তার কাল্ট তৈরি করল কে? আমরা কি তাকে সচেতনভাবে অতিমানবীয় কোন জায়গায় স্থান দিই নাই? ৩০ তম বিসিএসের সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় কে হয়েছিল? আপনি জানেন? আমি জানিনা। কেন জানিনা? সুশান্তর চেয়ে তার পার্থক্য খুব বেশি? সুশান্ত যদি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার কারণে বিখ্যাত হয়ে থাকে, তাহলে পাশের রুমের নাসির ভাই আর রুমমেট মাসুম ভাই কি দোষ করছে? মেধাতালিকার শীর্ষে থাকার কারণে যদি সুশান্ত খ্যাতির চূড়ায় উঠে যেতে পারে, তাহলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ইউনিটে প্রতিবছর চার জন এবং বিসিএস এর সম্মিলিত/ক্যাডারভিত্তিক মেধাতালিকায় ঢাবি’র ভাইদের কে আমরা সেভাবে মূল্যায়ণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি কেন?

 

কেউ হয়তোবা উত্তর দেবেন যে, ঢাবি’র হেজিমনি তে সে আঘাত করছে বলেই সে শুরু থেকেই খ্যাতির চূড়ায়। হয়তোবা। হ্যাটট্রিক করা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন কে হারিয়ে যদি কেউ চ্যাম্পিয়ন হয় তাহলে সে একটু বেশিই খ্যাতি পাবে।

 

কিন্তু সুশান্তর এই সেলিব্রেটি হয়ে ওঠার পেছনে কি আমাদের কোন হাত নেই? আপনি কি এতটাই শিওর? ৩৪ তম’র ৩৪ টোটকা কি আপনি মনোযোগ দিয়ে পড়েন নাই? না পড়লে ঠিক আছে। পড়লেও ঠিক আছে। কোন সমস্যা নাই। কিন্তু সমস্যা হয় অন্য কোথাও। সমস্যা হয় যখন প্রথম শ্রেণির একজন আমলা কে আমরা প্রথম শ্রেণির একজন সেলিব্রেটি হিসেবে স্থান দিই। এক্ষেত্রে ব্যাপারটার একটা বাণিজ্যিক মূল্যও আছে। কোচিং সেন্টার, ক্যারিয়ার সেন্টার রা তো এদেরকে দিয়েই ব্যবসা করে। আর তারা ব্যবসা করার সুযোগ ক্যামনে পায়? কারণ তাদের প্রতি আমাদের একটা দুর্বলতা থেকেই যায়। ও দাদা তো ফার্স্ট হইছে, দাদার কাছেই টিপস নিতে হইব। টিপস না নিলে আমি ক্যামনে ক্যাডার হমু? দাদা কোন ক্যাডারটা ফার্স্ট চয়েজ দেয়া যায় বলেন তো? দাদা, কোন বইটা পড়লে সহজে ক্যাডার হওয়া যাবে? দাদা, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য কত ঘন্টা পড়তে হবে? দাদা আমি তো ইংলিশে পড়ি, আমি কি ইকোনমিক ক্যাডার হইতে পারব?

 

তখন দাদারাও মাইক হাতে বেশ গর্বের সুরে বলার সাহস পান। আমি হেন করেছিলাম। জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বিসিএস বানাইছিলাম। আমি জানতাম আমি ৮৭ তম বিসিএসে ফার্স্ট হতে যাচ্ছি। ২.৭৩ নিয়া আই.বি.এ তে চান্স পাইছিলাম। কানেক্টিং দ্য ডটস.. এটসেট্রা এন্ড এটসেট্রা……..

এবার ঘটনায় আসি, (দাদার ভাষ্যমতে) তিনি র‌্যাগিং এর বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে কতগুলো বানোয়াট এবং উদ্ভট কথাবার্তা বলেছেন। হয়তোবা তিনি এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছেন। কারণ ধরেই নিতে পারি যে, পরপর দুই বার টিএসসির অপমান তিনি সহ্য করতে পারেন নি।

 

আমাদের ইগোতে লাগল খুব। খুবই স্বাভাবিক। আমরা যথাসম্ভব ওয়েতে প্রতিবাদ জানালাম। প্রতিবাদ তার কানে গেল। তিনি এডিট করলেন, কিন্তু আমাদের হুংকার থামল না। তিনি পোস্ট ডিলিট করলেন। তারপর ক্ষমাও চাইলেন। আর একবার খেয়াল করুন, তিনি যে প্লাটফর্মে (ফেসবুকে) ঢাবিকে অপমান করেছেন, সেই একই প্লাটফর্মে এসে সেটার জন্য ক্ষমাও চাইলেন।

 

এবার আমাদের কি করা উচিৎ? আহত হিসেবে আমাদের কাছে তার ক্ষমা প্রার্থনা হাস্যকর মনে হতে পারে। সুশান্তের অপরাধ কি? আমাদের সম্মানে আঘাত দিছে, প্রতিকার কি? আমাদের সম্মান পুনরুদ্ধার করা। উপায় কি? ব্যাটারে ক্ষমা চাইতে হবে? তিনি তো সেটা করেছেনই। এরপর আর কি করা যেতে পারে?

 

এরপর আরও অনেক কিছুই করা যেতে পারে। আমরা জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসাথে গর্জে উঠলে দোর্দন্ড প্রতাপশালী সামরিক সরকারের ভিত পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গর্জে উঠলে আইউব খান, এইচ. এম. এরশাদ, ফখরুদ্দিন, মঈন উদ্দীন দের গদি নড়বড়ে হয়ে ওঠে। আর সুশান্ত সে তো কোন ছাড়!!!! এখন চিন্তা করে দেখুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশান্তের নামে মানববন্ধন করা কি মশা মারতে কামান দাগানোর মত নয়?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি চায়, সুশান্তর চাকুরির বারটা পর্যন্ত বাজায় দিতে পারে। কিন্তু সেটা করা কতটুকু নৈতিক হবে? সুশান্ত যদি ঘাউরামো করতো তাও একটা ব্যাপার ছিল। সেতো নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছেই। তার ব্যাপারে কঠোর হওয়ায় আমার মোরালিটি তে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করছি না। কেন করছিনা? কারণ ব্যাটা এখন অসহায়। এমনিতেই তার হাতে হারিকেন উঠেই গেছে। আর তার …… য় বাঁশ দেয়া কি খুব জরুরী?

 

আর যাঁরা এখন সুশান্ত’র নৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আপনাদের (বিশেষত আপুদের) বলব, আপনারা অনেক সরল বিশ্বাসে সুশান্তের কাছে পরামর্শ নিতে গেছিলেন জানি, হয়তোবা অনেকেই খুব একটা এক্সপেক্টেড বিহেভিয়র পান নাই। ঠিক আছে, বেচারারে মাফ করে দিন। আর যদি আপনারা সত্যিকারার্থেই সাবস্ট্যানশিয়ালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে বিচার-ব্যবস্থার শরণাপন্ন হতে পারেন। আশা করছি, আপনারা আইনি সহযোগিতা পাবেন। কারণ সহযোগিতা তারাই পান, যাঁদের এটা দরকার।

 

একবার ভাবুন, প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় কারা? আর ক্ষমা করে কে? দুর্বল রাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়, আর শক্তিশালীরা হয় ক্ষমাপরায়ণ? আমরা ঢাবিয়ান রা কি ক্ষমা করতে পারি না? আমাদের মাঝে কি সিমপ্যাথি কাজ করেনা? নাকি সুশান্তের প্রতি আমাদেরও এলার্জি আছে? তার তারকাখ্যাতির ব্যাপারে এলার্জি? আশা করব, সুশান্তর পরিস্থিতিটাকে মানবিক দিক দিয়ে বিবেচনা করার মত উদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আচ্ছা, সুশান্তর ব্যাপারে উদার না হোন, প্রগতির এই লালনভূমিতে আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতাটুকু সম্মান পাবে এইটুকু আশা করতেই পারি।

Advertisements